কবুতরকে শান্তির প্রতিক বলা হয় কেন?

কবুতরকে শান্তির প্রতিক বলা হয় কেন?
বিভিন্ন সম্মেলন শুরু করার আগে সভাপতি বা প্রধান অতিথি কবুতর উড়িয়ে সম্মেলনের সূচনা করেন। আবার অনেক মন্ত্রিসভার সপথ অনুষ্ঠান শুরু হয় কবুতর উড়িয়ে। এর কারণ হিসেবে বলা হয় কবুতর শান্তির প্রতিক, তাই কবুতর উড়িয়ে সম্মেলনের শান্তি কামনা করা হয়। এসব দেখে আমাদের মনে প্রশ্ন উদয় হয়, এত পাখি থাকতে কবুতরকে কেন শান্তির প্রতিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আপনাকে লেখাটি পড়তে হবে।
আপনি আরো পড়তে পারেন….. পাখিদের কারেন্ট শক করে না কেন?new update!

ঘাম কি? মানুষ ঘামে কেন?discover now!


কবুতরকে শান্তির প্রতিক বলা হয় কেন?

কবুতর শান্তির প্রতিক বলা হয় কেন?


আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে প্রাচিন মিশরে প্রথম কবুতরকে গৃহপালিত পাখি হিসেবে পোষা শুরু হয়। তাহলে বুঝতেই পারছেন কবুতর কত কাল আগে থেকেই আদুরে পাখি হিসেবে মানুষের মনে স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থে কবুতরকে নিয়ে কাহিনী রচিত আছে, এর পাশাপাশি লোখমুখে প্রচলিত প্রাচিন লোকসাহিত্যে কবুতরের অনেক কাহিনী পাওয়া যায়।

যেমন প্রেমিকের চিঠি কবুতর ঠোঁটে নিয়ে প্রেমিকার বাড়িতে নিয়ে যায়। এই কাহিনী গুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই কবুতরকে শান্তির প্রতিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাহলে আর দেরি নয় আসুন কাহিনীগুলো থেকে জেনে নেই কবুতরকে কেন শান্তির প্রতিক বলা হয়?


১। গ্রিক রূপকথায় কবুতর শান্তির প্রতিক


গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি হলো প্রেম ও রোমাঞ্চের দেবী। আফ্রোদিতির জন্ম হয় কবুতর টানা রথের উপর। আফ্রোদিতি কবুতর খুব পছন্দ করতেন। তার চারপাশে বেশিরভাগ সময় কবুতর ঘোরাঘুরি করতো।

বিভিন্ন সময় তার হাতে কবুতর থাকতো। এই কারণে প্রাচিন গ্রিসের লোকজন কবুতরকে শান্তির প্রতিক মনে করতো।

দেবী আফ্রোদিতি
দেবী আফ্রোদিতি


২। এজটেক ধর্মে কবুতর শান্তির প্রতিক


প্রাচিন এজটেক সভ্যতার মানুষরা মনে করতো নবী নূহ (আঃ) এর সময় মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়। মহাপ্লাবন শেষে পৃথিবী থেকে পাপ দূর হলে দেবি জোচিকুইজাল(Xochiquetzal) কবুতরের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

এই দেবি হলো মানবতার জননী। এই কারণে এজটেক সভ্যতার আমলে কবুতর শান্তির প্রতিক বিবেচনা করা হতো।

দেবি জোচিকুইজাল(Xochiquetzal)
দেবি জোচিকুইজাল(Xochiquetzal)


৩। হিন্দু পুরানে কবুতর


হিন্দু পুরানে কবুতর প্রেম ও কামের দেবতা কামদেবের বাহন হলো কবুতর। তাই প্রাচিন ভারতের কিছু অঞ্চলের মানুষ কবুতর শান্তির প্রতিক মনে করতো।

কামের দেবতা কামদেব
কামের দেবতা কামদেব


৪। বাইবেলের বর্ণনায় কবুতর শান্তির প্রতিক


বাইবেলের বর্ণনায় কবুতর শান্তির প্রতিক বলা হয়। বাইবেলের বর্ণনা হতে পাওয়া যায়। নবী নূহ (আঃ) তার উম্মতের পাপকার্যে বিরক্ত হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে পৃথিবীকে পাপ মুক্ত করার আবেদন করেন। নূহ আঃ এর আবেদনের প্রেক্ষিতে মহান সৃষ্টিকর্তা নূহ (আঃ) কে নৌকা তৈরি করার জন্য আদেশ করেন।

সৃষ্টিকর্তার আদেশে সাড়া দিয়ে নূহ (আঃ) কাঠের একটি বিরাট নৌকা তৈরি করেন। নৌকা তৈরী হয়ে গেলে তিনি প্রত্যেকটা জীবকে জোড়ায় জোড়ায় সংগ্রহ করেন এবং নৌকায় তোলেন। সৃষ্টিকর্তার আদেশে আকাশ থেকে অনবরত বৃষ্টিপাত হতে থাকে। টানা ৪০ দিন বৃষ্টিপাতের ফলে পৃথিবীর সমস্ত ভূভাগ নিমজ্জিত হয়। এবার নূহ (আঃ) স্থলভাগের খোঁজ করার জন্য নৌকা থেকে একটি কাক বাইরে প্রেরণ করেন। কিন্তু বেশ কিছু দিন পার হলেও কাকটি আর ফিরে আসে না।

দ্বিতীয়বার নূহ (আঃ) একটি সাদা কবুতরকে স্থলভাগের খোঁজ নেওয়ার জন্য নৌকা থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেন। কবুতরটি কয়েকদিন পর একটি জলপাই গাছের শাখা তার ঠোঁটে নিয়ে নৌকায় ফিরে আসে। এটা দেখে নূহ (আঃ) বুঝতে পারেন যে আশপাশে কোথাও স্থল ভাগ আছে এবং পৃথিবী আর পানির নিচে ডুবে নাই। এ কারণে সাদা কবুতর শান্তির প্রতিক হিসেবে ধরা হয়।


বাইবেলের আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়,
নবী যিশুর কাছে প্রিয় ছিল সাদা কবুতর। শান্তির দূত সাদা কবুতরের রূপে পৃথিবীতে অবতরণ করে।এ কারণে সাদা কবুতর শান্তির প্রতিক হিসেবে ধরা হয়।

 নূহ (আঃ) কাঠের একটি বিরাট নৌকা তৈরি করেন
নূহ (আঃ) নৌকা


৫। লোকসাহিত্যে কবুতর শান্তির প্রতীক

প্রাচীন এশিয়ায় দুইজন শক্তিশালী রাজা ছিলেন।দুই রাজার শক্তির ভারসাম্য ছিল। শক্তি-সামর্থ্য, সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র এবং বুদ্ধিতে উভয় রাজা ছিলেন সমানে সমান। একদিন দুই রাজার মধ্যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেল।

যথাসময়ে উভয় রাজা যুদ্ধের ডাক দিলো এবং নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য-সামন্ত জড়ো করল। প্রথম রাজা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যুদ্ধের সমস্ত পোশাক পরিধান করার পর রাজা মাথার শিরনাস্ত্র পরার জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই শিরোনাস্ত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর দেখলেন তার শিরোনাস্ত্রের উপর কবুতর বাসা বেধেছে। রাজার মা রাজাকে কবুতরের বাসা ভাঙতে নিষেধ করলেন। রাজা মাতৃ আজ্ঞা পালন করে কবুতরের বাসা ভাঙ্গা থেকে বিরত থাকলেন। তিনি শিরোনাস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে রওয়ানা হলেন। দ্বিতীয় রাজা প্রথম রাজা কে খালি মাথায় যুদ্ধ করতে দেখে যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেন। দ্বিতীয় রাজার প্রস্তাবে প্রথম রাজা সম্মত হলেন এবং আলোচনায় বসলেন।

দ্বিতীয় রাজা প্রথম রাজা কে খালি মাথায় যুদ্ধ করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। প্রথম রাজা কবুতরের ঘটনাটি খুলে বললেন। দ্বিতীয় রাজা ঘটনাটি শুনে ভাবলেন যে রাজা কবুতরের জন্য নিজের মাথার শিরোনাস্ত্র ত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে খালি মাথায় উপস্থিত হয় তার মত মহৎ মানুষের সাথে যুদ্ধ করা ঠিক নয়। দুইজন রাজাই যুদ্ধ বন্ধ করলেন এবং শান্তি স্থাপন করলেন।এ কারণে প্রাচীন এশিয়ায় কবুতর শান্তির প্রতিক হিসেবে ধরা হয়।


৬। ইসলাম ধর্মে কবুতরের সম্মান


মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার সাহাবী হযরত আবু বকর (রাঃ) কে সাথে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে হিজরত নামে পরিচিত। নবীকে ধরার জন্য তার পিছে পিছে কাফেরদের শক্তিশালী দল ঘোড়া নিয়ে তাড়া করতে থাকে।

একসময় কাফেরদল নবীর কাছাকাছি হলে, নবী আবুবকর কে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। তার আশ্রয় নেওয়ার পর গুহার মুখে কবুতর বাসা বানায় এবং ডিম পাড়ে। কাফের দল নবী কে খুঁজতে খুঁজতে নবীর আশ্রয় গ্রহণ করা গুহার সামনে চলে আসে। তারা কবুতরের বাসা এবং ডিম দেখে অনুমান করে এই গুহায় অনেকদিন থেকে কোন মানুষ প্রবেশ করেনি। তাই তারা আর না খুঁজেই ফেরত চলে যায়।

এভাবে নবীজি সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ এবং কবুতরের বুদ্ধিমত্তায় কাফেরদের হাত থেকে রক্ষা পান। এ কারণে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা কবুতর শান্তির প্রতিক হিসেবে মনে করে। (বিদ্রঃ ঘটনার স্বপক্ষে কোন দলিল আমার কাছে নেই। লোকমুখে শোনা ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে।)

মহানবীর গুহায় কবুতরের বাসা
মহানবীর গুহায় কবুতরের বাসা


৭। বিংশ শতকে কবুতর শান্তির প্রতীক


২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্যারিস শহরে শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করা হয় (World Congress for Peace in Paris,Vienne,Mosqow in 1949)। এই সম্মেলনের জন্য স্পেনের বিখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসো একটি মনোগ্রাম ডিজাইন করেন।

মনোগ্রামে তিনি একটি উড়ন্ত সাদা কবুতরের ঠোঁটে জলপাই গাছের শাখা অংকন করেন এবং কবুতর শান্তির প্রতিক হিসেবে বর্ণনা করেন। তার আঁকা মনোগ্রামটি সম্মেলন কমিটি কর্তৃক গৃহীত হয় এবং পরে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ও ব্যাপক পরিচিত হয়। আজ অবধি পৃথিবীর সর্বত্রই শান্তির প্রতীক হিসেবে কবুতরকে মনে করা হয়।

পাবলো পিকাসোর মনোগ্রামে কবুতর
পাবলো পিকাসোর মনোগ্রামে কবুতর


জলপাইয়ের শাখাকে শান্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয় কেন?


বাইবেলের বর্ণনামতে, নুহ (আঃ) মহাপ্লাবন শেষে স্থল ভাগের খোঁজ নেওয়ার জন্য কবুতরকে তার নৌকা থেকে বের করে দেন। কবুতর বেশ কয়েকদিন পর একটি জলপাই গাছের শাখা তার ঠোঁটে নিয়ে নৌকায় ফিরে আসে। নুহ (আঃ) এর থেকে বুঝতে পারেন যে কাছে স্থল ভাগ রয়েছে। মহাপ্লাবন শেষ হয়ে গেছে।

এরপর তিনি নৌকা থেকে বের হয়ে আসেন এবং পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এ কারণে কবুতরের পাশাপাশি জলপাই গাছের শাখাকেও শান্তির প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। জাতিসংঘের পতাকায় শান্তির প্রতীক হিসেবে জলপাই গাছের পাতার মনোগ্রাম আছে।

জাতিসংঘের পতাকায় শান্তির প্রতীক জলপাইয়ের শাখা
জাতিসংঘের পতাকায় শান্তির প্রতীক জলপাইয়ের শাখা

kobutor ke shantir protik bole keno?

Kobutor santir protik, kobitor santir protik, payra santir protik, why pigeon is called symbol of peace, pigeon is symbol of peace, olive branches symbol of peace.

pacemaker santo

লেখাটি ভালো লাগলে আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুণ।জ্ঞান বিতরণে সাহায্য করুন। আপনি ভালো লিখতে পারলে এই ওয়েবসাইট এ লেখা পাঠান।লেখা মনোনীত হলে পুরস্কার পাবেন।

আপনার মাথায় উদ্ভট কোন প্রশ্ন ঘুরছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছেন না। তাহলে দেরি না করে এই পোস্টের নিচে কমেন্ট বক্সে প্রশ্ন টি লিখুন।উত্তর পাবেন নিশ্চিত।

All photo credit Goes to sutterstock.com

92 / 100

2 thoughts on “কবুতরকে শান্তির প্রতিক বলা হয় কেন?”

  1. ধন্যবাদ। খুব ভালো লাগলো তথ্যবহুল পোস্ট। আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি

    Reply

Leave a Comment