ডেঙ্গু জ্বর কী? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার,প্রতিরোধ!

সূচিপত্র-Table Of Contents
  1. ডেঙ্গু জ্বর কী? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার,প্রতিরোধ!

ডেঙ্গু জ্বর কী? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার,প্রতিরোধ!

পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত। আর্সেনিক বিষক্রিয়া, লেড বিষক্রিয়া ও ঘাতক ব্যাধি এইডস নিয়ে যখন জনগণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ঠিক তখন আবার নতুন করে ফিরে আসা ডেঙ্গু জ্বর জনগণকে রীতিমত আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে আসছে ডেঙ্গু জ্বরের খবর।

ডেঙ্গু জ্বর কী? ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার,প্রতিরোধ!

আপনি আরো পড়তে পারেন ….. চিকুনগুনিয়া রোগ কী?চিকুনগুনিয়া লক্ষণ ও প্রতিরোধ! ….. কালাজ্বর কী? কালাজ্বর এর লক্ষণ ও প্রতিরোধ! …. ম্যালেরিয়া জ্বর কী? ম্যালেরিয়া জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিরোধ।

ডেঙ্গু জ্বর এর ইতিহাস

ডেঙ্গুর মহামারী প্রথম ঘটে ১৭৭৯ সালে জাকার্তা ও কায়রোতে। তবে সেই জ্বর ছিলো ডেঙ্গু-সদৃশ রোগ যার কারণ ছিলো শিকুনগুনিয়া ভাইরাস। এরপর ১৭৮০ সালে ডেঙ্গু জ্বর মহামারী আকারে দেখা দেয় ফিলাডেলফিয়াতে। ডেঙ্গু কিংবা ডেঙ্গু-সদৃশ আরো মহামারীর রিপোর্ট পাওয়া যায় উনিশ শতকে ও বিশ শতকের প্রথমদিকে।

এটা ঘটে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, কলকাতা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, হংকং, আমেরিকা, গ্রীস ও অস্ট্রেলিয়াতে। তবে সেসময় ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা তেমন ছিলো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডেঙ্গু জ্বরের মহামারীর ধরন বদলে যায়।ডেঙ্গু জ্বর আরো জটিল আকারে মহামারীর রূপ নেয়।

ডেঙ্গু হোমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু-শক সিনড্রোম-এর মত জটিল ধরনের ডেঙ্গু জ্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই বেশি ঘটেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৭ লাখেরও বেশি এবং ডেঙ্গু জ্বরে মারা গেছে প্রায় ৯ হাজারের বেশি লোক।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার প্রথম দেখা দেয় ফিলিপাইনে ১৯৫৪ সালে। এরপর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরের প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং ১৯৮৭ সালে ভিয়েতনামে সবচেয়ে বড় আকারে ডেঙ্গু মহামারী ঘটে। আমাদের দেশে ১৯৬৪ সালে একবার ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে।

সেসময় এই জ্বর ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত হয়। গত কয়েক বছরও ডেঙ্গুর ছোটখাট আক্রমণ হয়েছিলো। গত দুই শতাব্দী ধরে ডেঙ্গু জ্বর বিভিন্ন নামে পরিচিত হচ্ছে, যেমন ব্রেকবোনফিভার, ড্যান্ডিফিভার, জিরাফ জ্বর, পলকা জ্বর, ৫-৭ দিনের জ্বর, ঢাকা ফিভার, ইত্যাদি।

ডেঙ্গু জ্বর এর কারণ

ডেঙ্গু জ্বর যেভাবে ছড়ায়

ডেঙ্গু জ্বর ভাইরাসজনিত ব্যাধি। ডেঙ্গু ভাইরাস হল ফ্লাভো ভাইরাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪৪ সালে ডক্টর আলবার্ট সাবিন ডেঙ্গুর ভাইরাস সনাক্ত করেন এবং ডেঙ্গু-১, ডেঙ্গু-২ নামে দু’টো ভাইরাসকে আলাদা করেন। পরবর্তী কালে আরো দু’টি নতুন ডেঙ্গু ভাইরাস সনাক্ত করা হয় এবং এদের নামকরণ করা হয় ডেঙ্গু-৩ ও ডেঙ্গু-৪। এই ৪ ধরনের ভাইরাসই ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু-শক সিনড্রোম ঘটাতে পারে।

ডেঙ্গু রোগের জীবাণুর নাম কি?

ডেঙ্গু রোগের জীবাণুর নাম ফ্ল্যাভি ভাইরাস।

ডেঙ্গু ভাইরাসের নাম কী?

ফ্ল্যাভি ভাইরাস।

কোন মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয়?

এডিস এজেপটি ও এডিস এলবোপিকটাস নামের মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক। প্রথমটি সাধারণত শহর এলাকায় বেশি থাকে এবং এডিস এলবোপিকটাস গ্রামাঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়, তবে শহরেও থাকতে পারে।

ডেঙ্গু মশা(এডিস) চেনার উপায়?

এডিস মশা
এডিস মশা

এই মশা দেখতে নীলচে কালো বর্ণের। গায়ের উপর সাদা-সাদা ছোট-ছোট ছোপ। মশাটি মাটির সাথে সমান্তরালভাবে বসে। এই মশার আদিস্থান আফ্রিকার জঙ্গল বলে ধারণা করা হয়। সেখানে বর্ষাকালে গাছের কোটরে জমে থাকা পানির ভিতর এরা ডিম পাড়তো।

বৃষ্টির পর পূর্ণাঙ্গ মশার উৎপাত কমতে থাকে। ক্রমেই শহর গড়ে ওঠা এবং শিল্পোন্নয়নের সাথে সাথে এজিপটি মশার অভিযোজন ঘটে। শহুরে জীবনযাত্রার সাথে এরা খাপ খাইয়ে নেয়। তবে এখনও এডিস মশার বন্য ধরনটি আফ্রিকাতে পাওয়া যায়।

ডেঙ্গু মশা(এডিস) কোথায় ডিম পাড়ে?

শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে–চৌবাচ্চা, ফুলের নার্সারী–এসমস্ত জায়গা মশার ডিম পাড়ার আদর্শ স্থান। ডিম ফুটে মশায় পরিণত হতে সময় নেয় ৬ থেকে ৮ দিন। এই মশা সমুদ্র সমতলের ৪৫০০ ফুট উপরেও থাকতে পারে।

ডেঙ্গু মশা(এডিস) কখন কামড়ায়?

এই মশা সাধারণত দিনের বেলাতে কামড়ায়, বিশেষ করে খুব ভোরে এবং শেষ বিকেলে। ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রামিত স্ত্রী-প্রজাতির এডিস এজিপটি মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয়।

মশা কামড়ানোর কতদিন পর ডেঙ্গু জ্বর হয়?

মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে?

ডেঙ্গু জ্বর থাকে ৫ থেকে ৭ দিন।

ডেঙ্গু জ্বর কত দিনে ভালো হয়?

ডেঙ্গু জ্বর থাকে ৫ থেকে ৭ দিনে ভালো হয়। জ্বর ভালো হওয়ার পরে ৭-১৫ দিন পর্যন্ত এর উপসর্গ থাকতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর কি ছোঁয়াচে রোগ?

না, ডেঙ্গু জ্বর ছোঁয়াচে রোগ নয়।এটি একটি ভাইরাসঘটিত রোগ। মশার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়।

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ বা উপসর্গ

ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ বা উপসর্গ

শিশু, পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং পর্যটকদের এই রোগ বেশি হয়ে থাকে। ছোট শিশুদের বেলায় এই রোগ ততটা মারাত্মক আকারে দেখা দেয় না। তবে, একটু বড় বাচ্চা ও পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

ডেঙ্গু ক্ল্যাসিকাল জ্বর-এর লক্ষণ

এই জ্বরকে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর বলা হয়, কারণ এটি সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর ।

  • হঠাৎ করে জ্বর শুরু হয় (১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট)
  • মাথা ব্যথা
  • হাড়ে ব্যথা
  • চোখের পিছনে ব্যথা মাংসপেশীতে ব্যথা গিরায় ব্যথা
  • ক্ষুধামন্দা
  • সমস্ত শরীরে লাল রঙের ফুসকুড়িতে
  • ঢাকা, বিশেষ করে বুকে ও উর্দ্ধাঙ্গসমূহে।
  • এছাড়া রক্তে শ্বেতকণিকার পরিমাণ কম পাওয়া যাবে।
  • জ্বর সারার পর রক্তে এন্টিবডি টাইটার বেশি পাওয়া যাবে।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর এর লক্ষণ

  • হঠাৎ করে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। এই জ্বর দুই পর্যায়ে হয়ে থাকে।
  • জ্বরের সাথে মাথাব্যথা, কাশি ও বমি হতে পারে।
  • এরপর হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যায়।
  • এই সময়ের ২৪ ঘণ্টা আগ থেকে ২৪ ঘণ্টা পরবর্তী পর্যন্ত সময়কে বলা হয় সংকটপূর্ণ সময়। এই সময়টা খুবই জটিল।

এরপরই রক্তক্ষরণজনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়, যেমন:

  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া,
  • মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, পায়খানার সাথে রক্ত-পড়া, রক্ত বমি, শরীরে রক্তের চাকাও দেখা দিতে পারে।
  • এসময় রক্তের অণুচক্রিকার পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তনালী থেকে রক্তরস বেরিয়ে টিস্যুতে জমা হতে থাকে।ফলে ফুসফুসের ঝিল্লিতে পানি জমতে পারে, পেটে পানি জমতে পারে এবং রক্তে এলবুমিন কমতে পারে।
  • এসময় রক্তের ঘনত্ব মাপলে তা বেশি পাওয়া যেতে পারে।

রোগীকে এই সংকটাপন্ন সময়ে হাসপাতালে ইনটেনসিভ কেয়ারে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ২৪-৩৬ ঘণ্টা সময় সঠিকভাবে রোগীকে পরিচর্যা করলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।

প্রথমবার ডেঙ্গু জ্বরে হেমোরেজিক ফিভার হয় না। পরবর্তী সময়ে অন্য সেরোটাইপ ভাইরাসের আক্রমণে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার হতে পারে।

ডেঙ্গু-শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সমস্ত লক্ষণসমূহের উপস্থিতি ছাড়াও অন্যান্য যেসব লক্ষণ এই সিনড্রোমে দেখা যায় সেগুলো হলো:

  • দ্রুত ও দুর্বল নাড়ী
  • রক্তচাপ দ্রুত কমতে থাকে হাত-পা ঠাণ্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
  • অস্থিরতা বেড়ে যায়।

যেসমস্ত রোগী ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে ভোগে তার ২০-৩০ ভাগই ডেঙ্গু-শক সিনড্রোমে চলে যায়।এক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ থেকে ৫০ ভাগ। তবে ইনটেনসিভ কেয়ারে রোগীকে রাখলে মৃত্যুর হার ২%-এ নেমে আসে।

ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয়

এই রোগের গুরুতেই তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। জ্বর শুরু হবার পর থেকেই রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন এবং মহামারীর সময় ফিভার সার্ভিলেন্স করা প্রয়োজন।

এতে করে দ্রুত রোগ নির্ণয় করা যায়। এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও কমে আসে। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু-শক সিনড্রোম নির্ণয়ের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এগুলো দ্রুত রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে অথবা রোগ নির্ণয় ত্রুটিপূর্ণ হবার ঝুঁকিও কমে যায়।

ডেঙ্গু টেস্ট

ডেঙ্গু ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিম্নোক্ত ফলাফল দেখা যায়:

  • অণুচক্রিকার সংখ্যা ১ লাখ কিউবিক মি.মি. অথবা তার কম কণিকার ঘনত্ব বেশি পাওয়া যায় (২০ ভাগ অথবা তার বেশি।
  • রক্তে এলবুমিনের পরিমাণ কমে যায়।
  • ডেঙ্গু-শক ডিনড্রোমের ক্ষেত্রে উপরের বৈশিষ্ট্যের সাথে হাইপোটেনশন যুক্ত হয় অর্থাৎ রক্তচাপ- পারদযন্ত্রে ২০ বা আরো কম হয়।

প্রথম দু’টি ক্লিনিকাল বৈশিষ্ট্য এবং ১টা ল্যাবরেটরি পরীক্ষা যদি পজিটিভ হয় (অন্তত পক্ষে হিমাটোক্রিটের মাত্রা যদি বেড়ে যায়) তাহলেই ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বলা হয়।

ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর যেসব ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা প্রয়োজন সেগুলো হলো:

রক্তে অণুচক্রিকার পরিমাপ (ডেঙ্গু টেস্ট )

রক্তকণিকার ঘনত্বের (Haematocrit) পরিমাপ রক্তে ডেঙ্গু ভাইরাসের এন্টিবডি টাইটার-এর পরিমাপ। (রক্তে দু’ধরনের এন্টিবডি তৈরি হয়। প্রথমবার আক্রমণের ৫-৭ দিনের মধ্যে আইজিএম এন্টিবডি পাওয়া যায়। ১৪ দিনের মধ্যে আইজিজি এন্টিবডি পাওয়া যায়। একাধিকবার ডেঙ্গু-আক্রান্ত ব্যক্তির বেলায় আইজিজি এন্টিবডি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রক্তরসে অবস্থান করে)।

ভাইরাস আইসোলেশন (ডেঙ্গু টেস্ট)

আমাদের দেশে এখনও এর প্রচলন হয় নি
আমাদের দেশের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ল্যাবরেটরি ও আইসিডিডিআর,বিতে রক্ত পরীক্ষায় প্রায় ৬০% মানুষের দেহে এন্টিবডির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব থেকে বোঝা যায় ইতোমধ্যে প্রাথমিক ডেঙ্গু জ্বরে জনগণের একটি বিরাট অংশ আক্রান্ত হয়ে গেছে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে রক্তের কি কমে যায়?

ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা নামক রক্ত কণিকা কমে যায়।

ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেটস কত কমে?

সুস্থ মানুষের রক্তে প্রতি ঘন মিলিলিটারে দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ প্লাটিলেটস থাকে।ক্ল্যাসিক্যাল বা স্বাধারণ ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট সংখ্যা একটু কমলেও সাধারণত এক লাখের বেশি থাকে।হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট সংখ্যা এক লাখের কম থাকে।

প্লাটিলেটের সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে নামলে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। প্লাটিলেট যদি ৫ হাজারের কম হয়, তখন মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃৎপিণ্ডের মধ্য রক্তক্ষরণের ভয় থাকে।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে এই রোগের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা যায়।

ডেঙ্গু জ্বরের ঘরোয়া চিকিৎসা

ডেঙ্গু রোগী ঘরে থাকলে আলোবাতাস পূর্ণ ঘরে রাখতে হবে। তাকে সাহস জোগাতে হবে। প্রচুর জলীয় পদার্থ পান করতে।জ্বর আসলে মাথায় পর্যাপ্ত পানি ঢালতে হবে। শরীর স্পঞ্জ করে দিতে হবে।শরীর ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে কি খেতে হবে?

ডেঙ্গু জ্বর হলে পেঁপে খেতে হবে।ডেঙ্গু সারাতে পেঁপে পাতার রস পান করা যেতে পারে। পেঁপে পাতার রসে papain s chymopapain নামের উপাদান রয়েছে। যা রক্তের platelet-র সংখ্যা ও রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে।

পেঁপের পাতার রস কিভাবে খাবেন:

১. পেঁপের পাতার রস করতে পাতা ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার পাটা বা হাফল দিয়ে থেতো করে নিন। এরপর এতে পানি মিশিয়ে খেয়ে ফেলুন।

২. খেতে খারাপ লাগলে সামান্য মধু মিশান। তবে নিজে নিজেই পেঁপে পাতার রস খাওয়াতে যাবেন না। অতিরিক্ত পরিমাণে পেঁপে পাতার রস হিতে বিপরীত হতে পারে। সেজন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মোতাবেক কিভাবে ও কতটুকু রস খাবেন তা জেনে নিন।

ডেঙ্গু জ্বর হলে কি গোসল করা যাবে?

হ্যাঁ, ডেঙ্গু জ্বর হলে গোসল করা যাবে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয়

রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খেতে দেওয়া প্রয়োজন এবং রোগীকে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরই সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর রক্তক্ষরণ শুরু হয়; এসময় ৪৮ ঘণ্টা রোগীকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।

জ্বর সেরে যাওয়ার পর ৭ দিন সুস্থভাবে পার হলে বোঝা যাবে এবারকার মতো রোগী সুস্থ হয়ে গেছে। আবার যাতে মশা না কামড়াতে পারে সেদিকে খুব লক্ষ রাখতে হবে।

জ্বর সেরে যাওয়ার পর রোগীর যদি নাক, মাড়ি বা শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তপাত শুরু হয় অথবা প্রচণ্ড পেটব্যথা শুরু হয় কিংবা ত্বকের নিচে লালচে ছোপ দেখা যায়, তবে সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

ডেঙ্গু-শক সিনড্রোমে শিরায় স্যালাইন, রক্ত-সঞ্চালন বা অণুচক্রিকা সঞ্চালন-এর প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বর এর ঔষধ

ব্যথা ও জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল দিতে হবে। কখনোই এসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম বা আইবুপ্রফেনজাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না। এগুলোতে রক্তক্ষরণের মাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া ‘র‍্যা সিনড্রোম’ নামে এক মারাত্মক অবস্থা দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গু রোগী কখন হাসপাতালে ত্যাগ করবে?

  • এ-ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক একটি নীতিমালা নির্ধারণ করা আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে যে অবস্থায় রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারে তা হলো:
  • জ্বর কমানোর ওষুধ ছাড়াই যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আর জ্বর না আসে খাওয়ার রুচি ফিরে আসলে রোগীর উপসর্গ লক্ষ ক’রে সুস্থ মনে হলে প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসলে হিমাটোক্রিটের মাত্রা স্থিতিশীল হয়ে এলে।
  • রক্তে অণুচক্রিকার সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি থাকলে।
  • ফুসফুসে পানি জমার অথবা পেটে পানি জমার কারণে শ্বাসকষ্ট না থাকলে।
  • রোগী শক থেকে সেরে ওঠার ২ দিন অতিবাহিত হলে।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের উপায়

ডেঙ্গু জ্বরের কোনো প্রতিষেধক ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত না হওয়ায় প্রতিরোধই এই রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ আছে।

এই চারটার যেকোনো একটা থেকেই ডেঙ্গু জ্বর হয়। একবার কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে এবং সুস্থ হয়ে উঠলে যে-ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলো ঐ ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগীর আজীবন প্রতিরোধ-ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তবে বাকি ৩ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না।

ফলে রোগীর আরও তিনবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ একজন মানুষ ৪ বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।

সেকারণেই একবার ডেঙ্গু জ্বর থেকে সেরে উঠার পরও মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাহক মশার দমনই ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের প্রথম উপায়।

এডিস মশা নির্মূলের জন্য প্রয়োজন মাটির হাঁড়ি, বাড়িতে ফুলের টব, অব্যবহৃত কৌটা, ড্রাম, নারিকেলের মালায় পানি জমতে না দেওয়া বা স্যাঁতস্যাঁতে হতে না-দেওয়া কারণ এগুলোতে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে।

তাই প্রতিদিনই এসব পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি, এয়ারকুলারের পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

মশা নিধনের জন্য বাড়িতে মশার কয়েল, ম্যাট ও স্প্রে ব্যবহার করতে হবে, মশারী ব্যবহার করতে হবে, এমনকি দিনের বেলাতেও ব্যবহার করতে হবে। ঘরের দরজা ও জানালায় নেটিং-এর ব্যবস্থা থাকলে ভালো হয়।

ডেঙ্গু সচেতনতা সরকারি পর্যায়ে যা যা করণীয়

সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সেকশন-এর বিশেষজ্ঞ নিয়ে অবিলম্বে কমিটি গঠন করা আবশ্যক। প্রতিটি সেকশনের টিমকে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া জরুরী এছাড়াও যা যা করা উচিৎ-

  • মেডিকেল টিম গঠন
  • শহরে মশা নিধনের অভিযান চালানো
  • শহর এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান
  • ডেঙ্গু-জ্বর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন, যেমন: টেলিভিশন, বেতার,খবরের কাগজ, লিফলেট, ইত্যাদির মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো উচিত।

ডেঙ্গু মশা (এডিস) কিভাবে নিধন করবো?

পৃথিবীর যেসব দেশে ডেঙ্গু জ্বর মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে যেসব দেশে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে। চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিউবাতে প্রথম তেল ও সালফার ধোঁয়া দিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডিডিটি ব্যবহার করা হতো। এখনও কোনো কোনো দেশে ডিডিটি’র ব্যবহার আছে। থাইল্যান্ড ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এডিস মশা নির্মূলের জন্য লারভিসাইড এবং ম্যালাথিয়ন ফগিং ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সাথে ঘরবাড়ির বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার নিয়ম চালু আছে। মালয়েশিয়ায় ‘মসব্যাক’ নামে এক ধরনের কেমিক্যাল মশা নিধনে ব্যবহার করে সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে করণীয়

  • বস্তিগুলোতে ব্যাপক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও গণসচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে ডেঙ্গু জুরের প্রতিরোধের উপায় ও জটিল বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে।
  • ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশারীর মধ্যে রাখতে হবে।
  • স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিসগুলোতে সপ্তাহে বা মাসে ১ দিনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
  • শুক্রবার জুম্মার নামাজ ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইমাম সাহেব ও ডাক্তারের বা স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিরোধ বার্তা ছড়াতে হবে।
  • ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা না কমা পর্যন্ত খবরের কাগজে খুব প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো ছাপাতে হবে।
  • প্রতিবছর সিটি কর্পোরেশনগুলোকে মশক নিধনের জন্য নিয়মিত পর্যাপ্ত বাজেট রাখতে হবে ও কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
  • কন্ট্রোল রুম খুলে কেন্দ্রীয়ভাবে তা সমন্বয় করতে হবে এবং জনগণকে সংগঠিত করতে হবে।

লেখক
নন্দিতা নাজমা

Please Click on Just one Add to help us

মহাশয়, জ্ঞান বিতরণের মত মহৎ কাজে অংশ নিন।ওয়েবসাইট টি পরিচালনার খরচ হিসেবে আপনি কিছু অনুদান দিতে পারেন, স্পন্সর করতে পারেন, এড দিতে পারেন, নিজে না পারলে চ্যারিটি ফান্ডের বা দাতাদের জানাতে পারেন। অনুদান পাঠাতে পারেন এই নম্বরে ০১৭২৩১৬৫৪০৪ বিকাশ,নগদ,রকেট।

এই ওয়েবসাইট আমার নিজের খরচায় চালাই। এড থেকে ডোমেইন খরচই উঠেনা। আমি একা প্রচুর সময় দেই। শিক্ষক হিসেবে আমার জ্ঞান দানের ইচ্ছা থেকেই এই প্রচেষ্টা।