নিজ পরিবারের রক্ত নিলে মৃত্যু হতে পারে!!!

রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়ের রক্ত নিলে মৃত্যু হতে পারে!!

রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের থেকে রক্ত নিলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে?

নিজ পরিবারের কারো হঠাৎ রক্তের দরকার হলে আমরা প্রথমেই খুঁজে দেখি নিজেদের মধ্যে করো রক্ত দেয়া যায় কিনা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি? রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের রক্ত গ্রহন করলে রক্ত গ্রহীতার শরীরে কি ধরণের প্রভাব সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে আপনার ভালোবাসাযুক্ত রক্ত গ্রহীতার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই আসুন জেনে নেই এ বিষয়ে বিজ্ঞান কি বলে।আপনি আরো পড়তে পারেন….. তিল বা আঁচিল কেন হয়? আঁচিল কি শরীরের জন্যে ক্ষতিকর?

বাবা,মা,ভাই,বোন এর রক্ত নেয়া থেকে বিরত থাকুন!!

নিজ পরিবারের রক্ত নিলে “transfusion-associated graft versus host disease” (TA-GvHD) ছড়ানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

প্রক্রিয়াটি একটু জটিল কিন্তু এটাকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।যখন আপনি কোন অচেনা রক্ত দাতার থেকে এক প্যাকেট রক্ত নেন, আসলে আপনি যা নেন তা হচ্ছে প্যাকেট ভর্তি লোহিত রক্ত কনিকা ।

নিজ পরিবারের রক্ত নিলে মৃত্যু হতে পারে
রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়

প্লাজমা, শ্বেত রক্তকনিকা , অনুচক্রিকা সরিয়ে ফেলা হয় যতটা পারা যায়। একেবারে নিখুত করা যায় না, কিছু পরিমান লোহিত রক্তকনিকা আর প্লাটিলেট প্যাকেটে থেকেই যায়। এগুলো রক্তগৃহীতার জন্য ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং মাঝে মাঝে জীবন বিপন্ন করে ফেলে।

এই ঝুকিগুলোর একটা অংশ আসে রক্ত দাতার শ্বেত রক্তকনিকা থেকে। নির্দিষ্ট করে বললে T-cells থেকে।T-cell বা T-লিম্ফোসাইট হচ্ছে আমাদের প্রতিরক্ষা সিস্টেমের প্রধান নিয়ন্ত্রক। T-cell লিম্ফোসাইট রক্তের অদানাদার শ্বেত কণিকা হতে সৃষ্টি হয়। এদের প্রধান উৎপাদক ফ্যাক্টরি হলো অস্থি মজ্জা,লসিকা গ্রন্থি ও থাইমাস গ্রন্থি। T-cell লিম্ফোসাইট হলো মানবদেহের চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

T-cell লিম্ফোসাইট
T-cell লিম্ফোসাইট

দেহে কোন জীবানু বা বহিরাগত পদার্থ প্রবেশ করার পর সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরাজিত হলে T-cell লিম্ফোসাইট সর্বশেষ প্রতিরোধক হিসেবে এন্টিবডি উৎপন্ন করে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এরা বোঝে কোন কোষটা আমাদের দেহের আর কোনটা বাইরের। যখন আমাদের দেহে বাইরে থেকে রক্ত আসে, রক্ত দাতার দেয়া রক্তে থাকা T-cell গুলো রোগীর দেহে এসে তার দেহের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করবে কারণ সেটা তো তার চেনা না। দাতার T-cell লিম্ফোসাইট গ্রহীতার রক্তের T-cell গুলোকে বহিরাগত শত্রু বলে মনে করে। আবার গ্রহীতার T-cell গুলোও দাতার সাথে একই আচরণ করে। মজার বিষয় হলো দাতার T-cell সংখ্যায় কম হওয়ায় গ্রহীতার T-cell গুলো যুদ্ধে জয়ী হয়। ফলে রক্ত গ্রহীতার তেমন কোন ক্ষতি হয় না।

রক্তের T-cell লিম্ফোসাইট আক্রমণ করছে
রক্তের T-cell লিম্ফোসাইট আক্রমণ করছে

এবার আরো অবাক বিষয় হলো রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে জেনেটিক মিল থাকে। নিজ পরিবারের রক্তের T-cell লিম্ফোসাইট প্রায় একই রকমের হয়। কিন্তু বিপদের কারণ হলো এই T-cell লিম্ফোসাইট দেখতেই শুধু একরকম কাজে কিন্তু আলাদা।

অর্থাৎ আপনার দেহে আপনার মায়ের রক্ত প্রবেশ করালে আপনার T-cell গুলো মায়ের T-cell গুলোকে শক্র হিসেবে সনাক্ত করবে না। এই সুযোগে দাতার T-cell গুলো নিরব ঘাতক হিসেবে গ্রহীতার সর্বনাশ ঘটাবে।

অনেকের কাছে বুঝতে কঠিন লাগছে বোধহয়, তাই আসুন সহজ উদাহরণ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি।ধরুন আপনি ফুটবল খেলার জন্য মাঠে নেমেছেন এখন আপনার গোল পোস্টের সামনে বিপরীত পক্ষের একজন খেলোয়ার ঢুকে গেছে। ডিফেন্ডার হিসেবে আপনি যদি তাকে না আটকান তবে  কি হবে? কি আর হবে বিপরীত পক্ষের খেলোয়ার ফাকতালে গোল দিয়ে যাবে।

T-cell লিম্ফোসাইটেরর আক্রমণ
T-cell লিম্ফোসাইটের আক্রমণ

ঠিক এভাবেই যখন দাতার রক্ত থেকে আসা T-cell গুলোকে না আটকে ছেড়ে দেয়া হয়, তারা সংখ্যা বৃদ্ধি করে আপনার বডির T-cell গুলোকে ধ্বংস করে দেবে। এটাকে “Graft versus host effect” এখানে graft হচ্ছে দাতার দেয়া ব্লাড আর host হচ্ছে রক্ত গ্রহীতা। যখন রক্ত সঞ্চালনের সময় এটা হয় তখন এটাকে আর এই নামে না ডেকে “Transfusion-associated graft versus host disease” (TA-GvHD) নামে ডাকা হয়।

এর ফলে যেটা হতে পারে, আমাদের বডি ডিফেন্সে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যেমন কেমোথেরেপি বা অন্য কোন চিকিৎসা বা রোগ থাকলে রক্ত নেয়া ভেজাল হবে কারণ তখন ডিফেন্স এমনিতেই দুর্বল থাকে আর দাতার রক্তের টি সেল এই সুযোগটা কাজে লাগায়। একবার দাতার T-cell লিম্ফোসাইড জিতে গেলে খেল খতম। TA-GvHD তে ভুগতে হবে। এক্ষেত্রে রিকভারের অপশন নেই। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে পারেন।

এখন দেখেন, যিনি রক্ত নিবেন, তার ও দেহে তো T-cell আছে। এবং তার দেহে T-cell এর সংখ্যা দাতার রক্তের সাথে আসা T-cell এর থেকে অনেক অনেক বেশি। সে তো আর বিপক্ষ খেলোয়ার কে প্রতিআক্রমণ না করে বসে থাকবে না! (ম্যাগুয়ের টাইপ ডিফেন্ডার না হইলে! )

সে কি করবে? বিপক্ষ খেলোয়ার কে তার ডিফেন্স দিয়ে ধরে অকার্যকর করে ফেলবে।একটা সাধারণ প্রশ্ন, মাঠে ২২ টা প্লেয়ার থাকে,২ ভাগে ভাগ করে কি দিয়ে? জার্সি দিয়ে? এখন মনে করেন বিপক্ষ দলের খেলোয়ার আপনার গোলপোস্টেরর সামনে  আপনার জার্সি নিয়ে ঘুরছে। আপনি কি তাকে বিপক্ষ দলের খেলোয়ার ভাববেন? অবশ্যই না!

এটা হবে যখন আমরা প্রথম সাড়ির আত্মীয়ের(নিজ পরিবারের রক্ত) কাছ থেকে রক্ত নিব! তাদের রক্ত আর আমাদের রক্তের গঠন তো প্রায় একই। ফলে আপনার ডিফেন্ডার মানে আপনার দেহের T-cell বিপরীত পক্ষের  অর্থাৎ দাতার T-cell কে চিনতে পারবে না। চিনতে না পারলে আটকানোর প্রশ্নই আসেনা।

বিষয়টা এমন হবে আপনার দলের জার্সি পড়ে বিপক্ষ দলের খেলোয়ার আপনার গোলপোস্টে আর আপনার ডিফেন্ডার কিছু করার আগেই বিপক্ষ দলের খেলোয়ার গোল দিয়ে দেবে। অর্থাৎ (TA-GvHD) হয়ে যাবে!

তো কথা হচ্ছে আমরা কি এটা আটকাতে পারিনা? অবশ্যই পারব! কেন না? দেখেন ঘটনার মূল কোথায়? আপনার গোলপোস্টে বিপক্ষ দলের খেলোয়ার না আসলে গোল হবে? তাই আমরা যে প্যাকেট থেকে রক্ত নিচ্ছি তা 25 Gy Gamma radiation দিয়ে দিলে আর ঝুকি থাকছে না।

নিজ পরিবারের রক্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।

এখন অনেকে বলবেন, আমরা তো পরিচিত জনের মধ্যে রক্ত দেই, সমস্যা হয় না। কেন হয় না? দেখেন, সবসময় তো এমন না যে আপনার T-cell দাতার T-cell কে চিনতে পারবে না! বেশিরভাগ সময় চিনবে কিন্তু কিছু কিছু সময় মিস হওয়ার চান্স থাকে। তাই অচেনা দাতার রক্ত নেয়াই বেশি ভালো। তবে অবশ্যই ক্রসচেক করে নিতে হবে। অচেনা ব্যক্তির রক্ত নেয়ার আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করে নিবেন।

নিজ পরিবারের রক্ত,নিজ পরিবারের রক্ত,নিজ পরিবারের রক্ত,নিজ পরিবারের রক্ত,

মূল লেখকঃ Mahtab Mahdiপ্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশুনা করছেন।

pacemaker santo

লেখাটি ভালো লাগলে আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুণ।জ্ঞান বিতরণে সাহায্য করুন। আপনি ভালো লিখতে পারলে এই ওয়েবসাইট এ লেখা পাঠান।লেখা মনোনীত হলে পুরস্কার পাবেন।

আপনার মাথায় উদ্ভট কোন প্রশ্ন ঘুরছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছেন না। তাহলে দেরি না করে এই পোস্টের নিচে কমেন্ট বক্সে প্রশ্ন টি লিখুন।উত্তর পাবেন নিশ্চিত।

All photo credit Goes to sutterstock.com

88 / 100

3 thoughts on “নিজ পরিবারের রক্ত নিলে মৃত্যু হতে পারে!!!”

Leave a Comment