মাথা থেকে বাজে চিন্তা দূর করার উপায়

সকালবেলা দাঁত ব্রাশ করছেন নিশ্চিন্ত মনে হঠাৎ ভাবতে শুরু করলেন রাতে খেলায় বার্সেলোনা কেনো হেরে গেলো,মেসি কেন পেনাল্টি মিস করলো? চিন্তা করতে করতে এক ঘন্টে পার ব্রাশ মুখে শুকিয়ে গেছে সেদিকে আপনার ভ্রুক্ষেপ নেই। সারাদিন আপনি চিন্তা করেই চললেন। রাতে হঠাৎ মস্তিষ্ক স্থীর হলে ভাবেন ধুর সালা মিছেমিছি কি চিন্তা করছি? এটাই হলো বাজে চিন্তা বা বাজে টেনশন।

হুম! এবার বোধয় বুঝতে পারছেন বাজে চিন্তার ভয়াবহতা কি। বাজে চিন্তা আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেলে এবং মনোজগৎ এর ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে। অনেক সময় বাজে চিন্তার প্রভাবে প্রাত্যহিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটে। চাকুরিক্ষেত্রে সহকর্মীদের কাছে হাস্যরসের পাত্র হয়ে যায় অনেকে।

বাজে চিন্তা আসলে আমাদের সবার মনের মধ্যেই থাকে।কারও কারও মনে সেটা বেশি লাফালাফি করে।কেউ কেউ আবার তা বশে এনে রাখে এবং বাজে চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।কখনো আবার তিব্রতর বাজে টেনশন কোন মানুষকেই বশ করে ফেলে এবং মানুষটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। মানুষটি হয়ে যায় বাজে চিন্তার দাশ।দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির উপায় কি?

আপনি আরো পড়তে পারেন… রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়ের রক্ত নিলে মৃত্যু হতে পারে!!

হাঁচি কেন হয়? হাঁচির ভালো মন্দ!

মাথা থেকে বাজে টেনশন দূর করার উপায়

যাই হোক, অনেকেই এই বাজে চিন্তার ভুক্তভোগী। অনেক মানুষ বাজে চিন্তার জন্য স্বাভাবিক কাজকর্মও করতে পারেন না।মাঝরাতের দিকে জেগে থাকলে বা ঘুম ভেঙে গিয়ে আর ঘুম না ধরলে এরকম বাজে টেনশন বেশি হয়।

সঠিক কৌশল প্রয়োগ করলে এ ধরণের বাজে চিন্তার হাত থেকে খুব সহজে নিস্তার পাবেন। এবার আপনাদের জানাতে পারি বাজে টেনশন দূর করার উপায়গুলো।

মনের কুচিন্তা দূর করার উপায়

১)বাজে চিন্তার সময় যে কাজ করছিলেন তা বন্ধ রাখুন

আপনার মাথায় যখনই কোনও বাজে চিন্তা আসবে,তখন যদি ওই চিন্তা নিয়ে কোন কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে কাজের মধ্যে বাজে চিন্তার কুপ্রভাব আসবে।যেমন- পড়ার সময় বাজে টেনশনগুলো মাথায় আসলে বাজে চিন্তার প্রভাবে পড়াই বাজে হয়ে যায়।
তাই কোন কাজ করার সময় বাজে চিন্তা মাথায় আসলে কাজটি বন্ধ করে অন্য একটি সহজ কাজে মনোনিবেশ করুন।এতে করে বাজে টেনশন র স্রোতে বিঘ্ন ঘটবে।

২) বাজে চিন্তা খাতায় লিখুন

আপনার মাথায় ঘুরপাক খাওয়া বাজে চিন্তাটি খাতায় লিখে ফেলুন। চিন্তাটি উদ্ভট বা লজ্জাকর হলে নিজের লেখা পড়ে নিজেই লজ্জা পাবেন। এর ফলে আপনি আর চিন্তাটি করবেন না। বিশ্বাস করুন,৮০% ক্ষেত্রে বাজে চিন্তা লিখে ফেললেই বাজে টেনশন কমে যায় এবং সেদিনের জন্য ওই ফাজিল চিন্তা আর মাথায় আসে না।

এই কাজের জজন্য একটা পার্সোনাল ডায়রি রাখতে পারেন,না রাখলেও কোন কাগজে লিখে ফেলুন যা কেউ দেখবে না। লেখার সময় নিজেকে বোঝান, লিখুন কেন চিন্তাটা খারাপ এবং কেন আপনি এই চিন্তাটা করতে চান না। আপনার নিজের অভিভাবক নিজে হওয়ার চেষ্টা করুন।

বাজে চিন্তা খাতায় লিখুনঃ
বাজে চিন্তা খাতায় লিখুন

৩) বাজে চিন্তার কারণ খুঁজুন

বাজে চিন্তা কিসের বা কার জন্য আসছে? কি হলে আর সেই চিন্তা টা আসবে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন। যেমন ধরুন,আপনার অতীত জীবনে কোন কিছু না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ আছে, সেই আক্ষেপগুলো বর্তমানে আপনাকে দগ্ধ করছে।এখন আপনি আক্ষেপগুলো লিখে ফেলুন,ভবিষ্যৎ এ আপনি ঐ না পাওয়া জিনিষ কিভাবে অর্জন করবেন তার একটি ছক কষে ফেলুন।

ভবিষ্যৎ এ কি কি করতে চান তার একটা পরিকল্পনা তৈরি করুন,যাতে আপনি সেই অতীতের অপ্রাপ্তিকে ছাপিয়ে অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারেন। যদি কোন ব্যক্তির কারণে আক্ষেপ তৈরি হয়,তাহলে মনে মনে চিন্তা করুন সেই ব্যক্তির চেয়ে আপনার জীবনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছে এবং আসবে।

বাজে চিন্তার কারণ খুঁজুন
বাজে চিন্তার কারণ খুঁজুন

৪) অলসতা বর্জন করুন

বাজে টেনশন আসার বেশির ভাগ কারণ হচ্ছে “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আখরা!” কোন কাজ না থাকলে মাথায় বাজে চিন্তার উদয় হয় বেশি।আপনি বলতে পারেন,”কই নাতো!আমার তো কাজ আছে।তারপরও বাজে টেনশন আসছে!’ তাহলে বুঝতে হবে,আপনি আপনার কাজকে গুরুত্ব দেন নি। আপনার কাজের গুরুত্বেরর চাইতে ফাজিল কিছু চিন্তার গুরুত্ব বেশি ছিল।

আপনি যখন ১৬ ঘন্টা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে থাকবেন,আপনার মাথায় বাজে চিন্তা আসার প্রকোপ কমে যাবে।যেমন, খাওয়ার সময়ও আপনি ভাবছেন,কিভাবে অফিসের প্রজেক্টটা আপনি শেষ করবেন,কারণ খাওয়ার পরও প্রজেক্ট এ লেগে যেতে হবে।এরকম ব্যস্ততায় থাকলে বাজে চিন্তা আপনার মাথায় আসার সাহসই পাবে না!

অলসতা বর্জন করুন
অলসতা বর্জন করুন

৫) অতীত স্মৃতি জাগ্রত করে এমন কাজ করবেন না

অতীতের কোন ভালোবাসার কথা মনে পড়ে যায় কোন গান শোনার সময়? ওই ধরনের গান শোনাই পুরোপুরি বন্ধ করে দিন।বসে বসে থ্রিলার মুভি দেখুন। মজাদার কৌতুক পড়ুন বা ফানি ভিডিও দেখুন,যতই বাজে টেনশন থাকুক,হাসির তোড়ে সব উড়ে যাবে।

৬)মেডিটেশন করুন

যাদের মেডিটেশন করার অভ্যাস, তারা কিংবা করেছেন আগে,তারা অবশ্যই মেডিটেশন করুন।এটা ভালো ফল দিবে! মেডিটেশন করলে মস্তিষ্ক শান্ত হয়। চিন্তা শক্তি প্রখর হয়।কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। স্থীর মস্তিষ্কে বাজে টেনশন আশার প্রশ্নই উঠে না।

মেডিটেশন করুন
মেডিটেশন করুন

৭) নতুন দায়িত্ব কাধে নিন

যখন দেখবেন কোন দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ এসেছে,ভয় লাগলেও দায়িত্ব টা নিয়ে ফেলুন।মাথায় দায়িত্বভার থাকলে বাজে চিন্তারা ঢুকতে ভয় পায়।

নতুন দায়িত্ব কাধে নিন
নতুন দায়িত্ব কাধে নিন

৮)বাজে চিন্তার পেনাল্টি নিন নিজে

হঠাৎ মাথায় কুচিন্তা আসলে নিজেই নিজেকে ধমক দিন এবং শাসন করুন এতে বাজে টেনশন বাপবাপ করে পালাবে। যেমন-পড়ার সময় মাথায় বাজে টেনশন আসলে নিজেকে ধমক দিন যে পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেবিল থেকে উঠবেন না। এই জেদের কারণে বাজে টেনশন সহজেই দূর হবে।

বাজে চিন্তার পেনাল্টি নিন নিজে
বাজে চিন্তার পেনাল্টি নিন নিজে

৯) পর্যাপ্ত ঘুমান

রাতে ৬-৭ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমালে মস্তিষ্ক সতেজ থাকে। সতেজ মস্তিষ্কে বাজে টেনশন কম আসে।

১০) কাজের রুটিন তৈরি করুন

কাল কি করবেন তা আজই ঠিক করে ফেলুন। আগামি কালের কাজ করতে আপনার কি কি লাগবে তা গুছিয়ে রাখুন। কাজটি কিভাবে করবেন তার একটা খসড়া কাগজে লিখে ফেলুন এবং দুই একবার রিহার্সাল করে নিন।

এরকম রুটিন বদ্ধ জীবনযাপন করলে কাজটি গোছালো হয় এবং নিখুঁত হয়।কাজের ফলাফল শতভাগ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এধরনের জীবনযাপন আপনাকে চাপমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। চাপমুক্ত জীবনে বাজে টেনশন আসার সুযোগ পায় না।

কাজের রুটিন তৈরি করুন
কাজের রুটিন তৈরি করুন

১১) ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ত্যাগ করুন

কোন কাজ করবেন বলে মনস্থির করেছেন এমতাবস্থায় অনাগত ফলাফল নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন না। নিজের যতটুকু সামর্থ্য আছে তার সর্বাত্মক প্রয়োগ করুন। ফলাফলের ভার কর্তৃপক্ষের উপর ছেড়ে দিন।

যেমন- কাল আপনার চাকুরির ভাইভা আছে এই নিয়ে ভয়ে হাত পা ঘামানোর তো প্রয়োজন নেই নিজের কাজ ঠিকভাবে করুন খোশমেজাজে ভালোমানের প্রস্তুতি নিন। ভাইবা বোর্ডে সাহসিকতার সাথে নিজেকে উপস্থাপন করুন। ফলাফলের চিন্তায় নিজেকে গুটিয়ে ফেলবেন না। মনে মনে ভাবুন চাকুরি না হলে আপনার দোষ নেই কারণ আপনার সামর্থ্যানুযায়ী সর্বোচ্চ করেছেন।

১২) চুটিয়ে বাঁচুন গুটিয়ে নয়

পরিবার কে সময় দিন। সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে বাইরে ঘুরতে যান। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিন। দেখবেন জীবনটা কত আনন্দময় হয়ে গেছে। আনন্দময় জীবনে কুচিন্তার কোন স্থান নেই।

13)অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন

করুনতুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের প্রতি অতিরিক্ত আবেগী মনোভাব দূর করা উচিত।উদাহরনস্বরূপ, গবেষকদের মতে প্রিয় ফুটবল দলের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হারও বেড়ে যায়। তাই তুচ্ছ কারণে উত্তেজিত হবেন না। কারণ জীবনের মূল্য এর চেয়ে ঢের বেশি।

মনের কুচিন্তা দূর করার উপায়

মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা করে রাখার অভ্যাস কখনোই হৃদযন্ত্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। গবেষনায় দেখা গিয়েছে ক্ষমা করার পরিবর্তে ক্ষোভ জমা করে রাখলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে হৃদ্ররোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ে।

ডক্টর সিমন্স বলেন “আপনি ভাবতেই পারবেন না মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা থাকলে তা কত দ্রুত এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ক্ষতি সাধন করে। তাই নিজের ঘাঁড় থেকে এই আপদ নামিয়ে মানসিকভাবে সুস্থ থাকুন সবসসময়।”

মনের আতঙ্ক দূর করার উপায়

ভয়েরও একটা আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। ভয় আপনাকে কাজ করার জন্য উদ্যত করতে পারে। আপনি যে জিনিসটাকে ভয় পান, নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে সেই জিনিসটাই করুন। যেহেতু আপনি ভয় পাচ্ছেন, ব্যাপারটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। এই চ্যালেঞ্জটাকেই জিতে আসুন।

সর্বোপরি মনে রাখবেন,আপনার সমস্ত চিন্তার নির্ধারক আপনি নিজেই।আপনি নিজে যদি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকেন,তাহলে কোনোভাবেই মনের বাজে চিন্তা আপনার মগজের ঘিলুতে চেপে বসবে না।

শ্রেয়সী সাহা
ময়মনসিংহ মেডিকেল থেকে
MBBS পাশ করেছেন
এই লেখকের লেখার ছায়া অবলম্বনে কন্টেন্ট টি লেখা হয়েছে।

pacemaker santo

লেখাটি ভালো লাগলে আপনার প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করুণ।জ্ঞান বিতরণে সাহায্য করুন। আপনি ভালো লিখতে পারলে এই ওয়েবসাইট এ লেখা পাঠান।লেখা মনোনীত হলে পুরস্কার পাবেন।

আপনার মাথায় উদ্ভট কোন প্রশ্ন ঘুরছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছেন না। তাহলে দেরি না করে এই পোস্টের নিচে কমেন্ট বক্সে প্রশ্ন টি লিখুন।উত্তর পাবেন নিশ্চিত।

All photo credit Goes to sutterstock.com and getty image

92 / 100

Leave a Comment