সারোগেসি কি? সারোগ্যাসি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা।

সারোগেসি কি? সারোগ্যাসি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা।

ধরুন আপনার স্ত্রী সন্তান ধারণে অক্ষম আপনি কখনো বাবা হতে পারবেন না তখন পিতৃত্বের স্বাদ ভোগ করার জন্য অন্যের সন্তান দত্তক নিতে হয় কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকের মনে একটা ব্যথা থেকেই যায় প্রকৃত বাবা না হওয়ার জন্য। মানে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত অবস্থা আরকি।

তখন সবাই চায় নিজের রক্ত ধারণকারী সন্তানের বাবা হতে। যাতে সন্তান কে বলা যায় তোর শরীরে আমার রক্ত বইছে।এটা করার জন্য আপনাকে হয় নতুন বিয়ে করতে হবে নাহয় অবৈধ উপায়ে অন্য মহিলার গর্ভে সন্তান উৎপন্ন করতে হবে।

এই কাজে তো আপনার স্ত্রী রাজি হবেন না।আপনার সংসার ভেঙ্গে যাবে।আপনি আবার স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন, স্ত্রীকে ছাড়তে পারবেন না।

তাহলে উপায় কি? হ্যাঁ উপায় আছে, আপনার শুক্রাণু ও আপনার স্ত্রীর ডিম্বানু নিষিক্ত করার পর অন্য মহিলার জরায়ুতে স্থাপন করলে তার গর্ভে আপনার সত্যিকারের সন্তান বেড়ে উঠবে এবং যথাসময়ে ভূমিষ্ঠ হবে আর আপনি হয়ে যাবেন প্রকৃত বাবা।আপনাকে বাবা বানানোর এই প্রক্রিয়াই হলো সারোগেসি।

সারোগেসি কি? সারোগ্যাসি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা।

কি ভাবছেন? সারোগ্যাসি আধুনিক যুগের কোন নতুন আবিষ্কার?না, আপনি ভুল ভাবছেন। বিষয়টি আপনার কাছে নতুন বা অচেনা মনে হলেও সারোগেসির ধারণা মোটেও নতুন নয় এটি প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত একটি কনফিডেনসিয়াল প্রথা।


সন্তানহীন মা কে মাতৃত্ব উপভোগ করাতে এই পদ্ধতির ব্যবহার প্রাচীন বিশ্বে প্রচলিত ছিল। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট সহ মহাভারতের মত অনেক ধর্মগ্রন্থে বিষয়টি বর্ণনা করা আছে।

বর্তমানে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা শাহরুখ খান এই প্রক্রিয়ায় ৩য় সন্তান নিয়েছেন।
তাহলে আসুন জানাযাক সারোগ্যাসি বিষয়ে খুটিনাটি…..

আপনি আরো পড়তে পারেন…… থ্রি প্যারেন্ট বেবি কি?

সারোগেসি কি?

সন্তান ধারণে অক্ষম কোন দম্পতির সন্তান অন্যকোন মহিলার গর্ভে ধারণ করে জন্মদানের প্রক্রিয়াকে সারোগ্যাসি বলে। অর্থাৎ একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মহিলা অন্য কোনও দম্পতির হয়ে সন্তান ধারণ করার প্রক্রিয়া প্রক্রিয়া হলো সারোগ্যাসি।

সারোগেসি কেন করা হয়?

  1. মহিলাদের ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়। এই ডিম্বাণু শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে ভ্রূণ সৃষ্টি করে। ভ্রূণ জরায়ুতে বৃদ্ধি পায়। এরপর ৯মাস ১০দিনের গর্ভাবস্থা শেষে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কোন মহিলার জরায়ুতে সন্তান ধারণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকলে তিনি মা হতে পারবেন না। এই মহিলার জন্য মা হওয়ার সহজ পদ্ধতি হলো এটি ।
  2. আবার কোন মহিলার ডিম্বাণু যদি নিষিক্ত হওয়ার পর জরায়ুতে প্রবেশ করতে না পারে তখনো সন্তান ধারণ সম্ভব হয়না তখনো এই পদ্ধতির সাহায্য নেয়া হয়।
  3. অনেক সময় এমনো হতে পারে যে সন্তান ধারণ করলে মহিলার মৃত্য হবে বা সন্তান মায়ের দেহে জটিল বংশগত অথবা ভয়ংকর সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হবে সেক্ষেত্রে মাতৃত্ব উপভোগ করার জন্য ঐ মহিলার এই প্রক্রিয়া ছাড়া আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকেনা।
  4. অকালে রজঃনিবৃতি বা মেনোপোজ হলে মা হওয়ার জন্য এই পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হয়।
  5. এক কথায় কোনও দম্পতি সন্তান লাভের ক্ষেত্রে সমস্ত দিকে ব্যর্থ হলে সারোগ্যাসির শরণাপন্ন হতে হয়।

সারোগ্যাসি প্রকারভেদ

এটি দুই ধরণের যথা- ১।পার্শিয়াল সারোগ্যাসি ২। ট্রু সারোগ্যাসি বা আইভিএফ সারোগেছি

পার্শিয়াল সারোগ্যাসি

দম্পতির মধ্যে স্ত্রীর ডিম্বাণু উৎপাদন ক্ষমতা না থাকলে স্বামীর শুক্রাণু সংগ্রহ করে যে মহিলা গর্ভ ভাড়া দেবে তার ডিম্বাণুর সাথে নিষেক ঘটানো হয়। এতে স্ত্রী সত্যিকারের জিনেটিক মা হতে পারেন না তিনি এক ধরণের সৎ মা। মানে তারকাছে সন্তানটি শুধু তার স্বামীর সন্তান। এতে আসল মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া যায় না।

পার্শিয়াল সারোগেসি, সারোগেসির প্রকারভেদ
পার্শিয়াল সারোগেসি

ট্রু সারোগ্যাছি বা জেস্টেশনাল সারোগ্যাসি

নিঃসন্তান দম্পতির দেহ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে আইভিএফ পদ্ধতিতে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।এরপর সেই ভ্রূণ সারোগেট মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি এটা অধিকাংশ নিঃসন্তান দম্পতি এই পদ্ধতির সাহায্যে সন্তান নেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে দম্পতির পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নিয়ে কোনো সংশয় থাকে না। কারণ এখানে সারোগেট মাদার শুধু একজন হোস্ট হিসেবে কাজ করে।

ট্রু সারোগেসি বা জেস্টেশনাল সারোগেসি, সারোগ্যাসির প্রকারভেদ
ট্রু সারোগ্যাসি বা জেস্টেশনাল সারোগ্যাসি
সারোগ্যাসি পদ্ধতি কি?

সারোগেসি কীভাবে করা হয়?

সারোগ্যাসির কলাকৌশল আধুনিক যুগে খুব একটা জটিল নয়। এটি করার জন্য কিছু উপকরণের দরকার হয়। যেমন-

গর্ভ ভাড়া করা

সন্তান ধারণে অক্ষম দম্পতির অন্য একজন মহিলার গর্ভ ভাড়া নিতে হয়। অর্থাৎ তাদের সন্তান অন্য মহিলার গর্ভে বেরে উঠবে। আবার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রকৃত বাবা তাদের সন্তান নিয়ে নেবে। মানে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্য মহিলাটি তার গর্ভে সন্তান বড় করবে। বৈধ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গর্ভ ভাড়া নিতে হয়। একটি চুক্তিপত্র তৈরি করা হয়। সন্তানের পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব নির্ধারণ করা হয় আদালতের মাধ্যমে।

সারোগেট মাদার

সন্তান ধারণে অক্ষম কোন দম্পতির সন্তান অন্য যে মহিলার গর্ভে লালিত হয় সেই মহিলাকে সারোগেট মাদার বলে। সারোগেট মাদার চুক্তিভিত্তিক তার গর্ভ ভাড়া দিয়ে থাকেন। এই কাজের জন্য তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।
তবে অনেক ক্ষেত্রে নিঃসন্তান দম্পতির নিকট আত্মীয় নিজের ইচ্ছায় সারোগেট মাদার হিসেবে কাজ করেন। ৯০ এর দশকে আমেরিকার এক নিঃসন্তান দম্পতির জন্য সারোগেট মাদার হয়েছিলেন তাদের মা।নিজের আত্মীয়দের মাঝে সারোগেট মাদার হওয়ার এরকম অনেক উদাহরণ আছে।

সারোগেট মাদার, সারোগ্যাসি পদ্ধতি কি? সারোগেসি কিভাবে করা হয়?
সারোগেট মাদার

আইনি কাগজপত্র ঠিক করা

সন্তানের অভিভাবকত্ব ঠিক করার জন্য দলিল তৈরি করতে হয়। আবার সারোগেট মাদারের ভাড়া মেটানোর চুক্তিনামা তৈরি করতে হয়।

সারোগ্যাসি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা।

কয়েকটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারোগ্যাসি সম্পন্ন করা হয়। প্রক্রিয়াটি টেস্টটিউব বেবির মত।

শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ

নিঃসন্তান দম্পতির দেহ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ত্রুটিমুক্ত করা হয়।

সারোগ্যাসি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা, শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ।
শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ

নিষিক্তকরণ

হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে সংগৃহীত শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেক ঘটানো হয়। এ ধরণের নিষিক্তকরণ কে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বলে। এরপর কৃত্রিম পরিবেশে ভ্রূণের প্রাথমিক বৃদ্ধি ঘটানো হয়।

সারোগেসি কি? সারোগ্যাসি পদ্ধতি কি?
নিষিক্ত করন

ভ্রূণ স্থানান্তর

ভ্রূণ তৈরির পর সেটিকে সারোগেট মাদার-এর জরায়ু বা ইউটেরাসে প্রতিস্থাপন করা হয়। স্বাভাবিক নিয়মে সন্তান জরায়ুতে বড় হতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় মানে ৯মাস ১০দিন পর সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।
সন্তান প্রসব হলে বাচ্চাটিকে জেনেটিক বাবা-মার হাতে তুলে দেওয়া হয়। একে জেস্টেশনাল সারোগ্যাসি বা আই ভি এফ সারোগ্যাসি বা ফুল সারোগ্যাসি নামেও ডাকা হয়।

ভ্রূণ প্রতিস্থাপন টেস্ট টিউব বেবি প্রসেস
ভ্রূণ প্রতিস্থাপন

সারোগেছির খরচ কত?

ইন্ডিয়াতে একটা সারোগেট সন্তানের জন্য ১০ লাখ থেকে ৩০/৪০/৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

ইতিহাস

১৯৮৫ সালে জেস্টেশনাল সারোগ্যাসির সাহায্যে আমেরিকায় বিশ্বের প্রথম শিশু জন্মায়। এক্ষেত্রে শিশুটির জেনেটিক বাবা-মা হিসেবে স্বীকৃতি পান সন্তান পেতে ইচ্ছুক দম্পতি। বায়োলজিক্যাল ও লিগ্যাল বাবা-মা হন অন্য মা ও তাঁর স্বামী।

ভারতীয় আইনে সারোগ্যাসি

২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল টাকার বিনিময়ে গর্ভ ভাড়া দেয়া বা বানিজ্যিক সারোগেছির হটস্পট, সারোগেছি বিল ২০১৬ পাশ হবার পর বানিজ্যিক সারোগেছি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। যদি নিকট আত্মিয় কোন মহিলা যদি স্ব-ইচ্ছায় গর্ভ দান করে বা সারোগেট মাদার হতে চায় তবে তা বৈধ ও আইন সঙ্গত।

একে অ্যালট্রুইস্টিক সারোগেসি বলে। অ্যালট্রুইস্টিক সারোগ্যাসিতে সারোগেট মাদারকে অন্তঃসত্তাকালীন অবস্থায় চিকিৎসা ও ইনস্যুরেন্স কভারেজ ছাড়া অন্য কোনও রকম অর্থ প্রদান করা যায় না।

ভারতে কখন সারোগ্যাসির অনুমোদন দেয়া হয়?

ভারতবর্ষে এটির অনুমোদন দেয়া হয় কিছু অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে।যেমন-

  • ১) কোনও দম্পতির বন্ধ্যাত্বের ক্লিনিক্যাল সুপারিশ
  • ২) স্ব-ইচ্ছায় গর্ভ দান করতে চায় বা সারোগেট মাদার হতে চায় এমন মহিলার স্বীকারক্তিমূলক সুপারিশ পত্র।
  • ৩) অর্থলাভের উদ্দেশ্যে গর্ভ ভাড়া না দেওয়া।

বাংলাদেশে সারোগেছি কি বৈধ?

বাংলাদেশে এটি অবৈধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশ আর ইসলাম ধর্মে সারোগ্যাসি হারাম। তবে গোপনে এটি চলতে পারে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে।

ইসলামিক আইনে সারোগেছি হালাল না হারাম?

বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কোন পুরুষের সন্তান গর্ভে ধারণ করা ইসলাম ধর্মে হালাল। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় সারোগেট মাদার পরপুরুষের সন্তান নিজের দেহে ধারণ করে সেহেতু এটি অবৈধ সন্তান। অবৈধ সন্তান ধারণ করা জেনার সমতুল্য।
এই কারণে ইসলামি চিন্তাবিদগণ সম্মিলিত ফতোয়া দিয়েছেন যে সারোগ্যাসি ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ হারাম।
১১ থেকে ১৬ ই অক্টোবর ১৯৮৬ সালে, জর্ডানের রাজধানী আম্মানে ইসলামিক ফিকহ একাডেমি কাউন্সিলের তৃতীয় অধিবেশনে ঘোষনা করা হয় যে, সারোগেছি ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

What is sarogesi in bangla? sarogesi system bangla?

Process of sarogesi in bangla, sarogesi ki?

Please click on Just one Add to Help Us

মহাশয়, জ্ঞান বিতরণের মত মহৎ কাজে অংশ নিন।ওয়েবসাইট টি পরিচালনার খরচ হিসেবে আপনি কিছু অনুদান দিতে পারেন, স্পন্সর করতে পারেন, এড দিতে পারেন, নিজে না পারলে চ্যারিটি ফান্ডের বা দাতাদের জানাতে পারেন। অনুদান পাঠাতে পারেন এই নম্বরে ০১৭২৩১৬৫৪০৪ বিকাশ,নগদ,রকেট।

এই ওয়েবসাইট আমার নিজের খরচায় চালাই। এড থেকে ডোমেইন খরচই উঠেনা। আমি একা প্রচুর সময় দেই। শিক্ষক হিসেবে আমার জ্ঞান দানের ইচ্ছা থেকেই এই প্রচেষ্টা। আপনি লিখতে পারেন এই ব্লগে। এগিয়ে নিন বাংলায় ভালো কিছু শেখার প্রচেষ্টা।