চুলকাতে মজা লাগে কেন? সহজ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, ত্বকে চুলকানোর সময় হালকা ব্যথা সৃষ্টি হয়, যা সাময়িকভাবে চুলকানির তীব্র সংকেতকে আটকে দেয়। এরপর মস্তিষ্ক এই ব্যথা প্রশমিত করতে সেরাটোনিন (Serotonin) নামক কেমিক্যাল ক্ষরণ করে, যা আমাদের সুখে থাকার অনুভূতি দেয় এবং চুলকানোতে আলাদা এক আনন্দ ও আরাম তৈরি করে।
চুলকাতে মজা লাগে কেন?
চুলকাতে মজা লাগে কেন?
টিকেট কাটতে লাইনে দাড়ালে দেখবেন কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক মানসম্মান চিন্তা না করে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে খসখস শব্দ করে চুলকাচ্ছে। দুনিয়াবি কর্মযজ্ঞে তার কোন খেয়াল নেই।মনেহয় চুলকিয়ে স্বর্গীয় সুখ পাচ্ছেন।

আবার অনেকে লুঙ্গির পেছনে হাত দিয়ে মুখ ভেংচিয়ে চুলকানির কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যান।কি আর করা বলুন একবার চুলকানি শুরু হলে কেউই না চুলকানো পর্যন্ত শান্তি পাননা। রাস্তায় চুলকানির মলম বিক্রেতা হকারের চটকদার বিজ্ঞাপন শুনলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রোগ এই চুলকানি।

যাইহোক এবার আসল কথায় আসি, দেহের কোন অঙ্গে চুলকানি শুরু হলে যতই চুলকাবেন ততই চুলকানি বাড়তে থাকে সাথেসাথে আলাদা একটি মজার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। একসময় এই মজার অনুভূতি বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ে পৌছায় তখন চুলকানোর স্থানটি ছিলে গিয়ে রক্ত বের হলেও আমরা গ্রাহ্য করিনা।
এতে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না কারণ চুলকানির এই সিস্টেম স্পেশাল স্নায়ুর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেক বকবক তো হলো এবার তাহলে জানাযাক চুলকাতে মজা লাগে কেন? এর বৈজ্ঞানিক কারণ।
আপনি আরো পড়তে পারেন – কুকুর মিলনের সময় আটকে যায় কেন ? চুলকানি সম্পর্কে 15 টি আশ্চর্যজনক তথ্য
শরীর কেন চুলকায় এবং চুলকানি কেন হয়?
আমাদের সমগ্র দেহকে বাইরের জীবাণু ও আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রোটেক্টিভ লেয়ার বা আবরণী রয়েছে, যাকে আমরা ত্বক (Skin) বলি। আমাদের ত্বকের প্রধান দুটি স্তর রয়েছে—বহিঃস্তর বা এপিডার্মিস (Epidermis) এবং অন্তঃস্তর বা ডার্মিস (Dermis)।
ত্বকের ডার্মিস স্তরে প্রুরিসেপ্টর (Pruriceptors) নামক বিশেষায়িত স্নায়ু গ্রন্থি বা রিসেপ্টর থাকে। এই রিসেপ্টরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর স্নায়ুতন্তু হলো সি-ফাইবার (C-fiber)। প্রধানত এই সি-ফাইবারের মাধ্যমেই ত্বকে সৃষ্ট চুলকানির সংবেদন বা সিগন্যাল সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কে পরিবাহিত হয়।
ডার্মিস স্তরে ইমিউন সিস্টেমের অংশ হিসেবে অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু কোষ থাকে, যাদের মাস্ট কোষ (Mast Cells) বলা হয়। মাস্ট কোষের মূল কাজ হলো দেহে ক্ষতিকারক বহিরাগত জীবাণু, অ্যালার্জেন বা কেমিক্যালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যখনই ত্বকের বহিঃস্তর (এপিডার্মিস) ভেদ করে কোনো ক্ষতিকর ধূলিকণা, পোকামাকড়ের লালা, কেমিক্যাল বা বহিরাগত পদার্থ ডার্মিস স্তরে প্রবেশ করে, তখন মাস্ট কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বহিরাগত জীবাণু বা অ্যালার্জেনকে ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয় করার জন্য মাস্ট কোষ তাৎক্ষণিকভাবে হিস্টামিন (Histamine) নামক একটি অ্যান্টি-অ্যালার্জিক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। এই নিঃসৃত হিস্টামিন যখন বহিরাগত পদার্থের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া ও প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে, তখনই ত্বকের স্থানীয় অংশে চুলকানির তীব্র উদ্দীপনা তৈরি হয়।

হিস্টামিনের ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট উদ্দীপনা ডার্মিসের প্রুরিসেপ্টরে পৌঁছালে তা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। প্রুরিসেপ্টর থেকে এই সিগন্যাল সি-ফাইবার স্নায়ুর মাধ্যমে প্রথমে আমাদের মেরুজ্জু বা সুষুম্নাকাণ্ডে (Spinal Cord) এবং পরবর্তীতে ব্রেনের থ্যালামাস ও সেন্সরি কর্টেক্সে প্রবেশ করে। মস্তিষ্ক সংকেতটি বিশ্লেষণ করে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আক্রান্ত স্থানে হাত বা নখ দিয়ে চুলকানোর নির্দেশ পাঠায়।
চুলকাইতে এতো আরাম লাগে কেন?
চুলকাতে মজা লাগে কেন? (স্নায়ুবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা)
আমরা যখন চুলকানি থামানোর জন্য নখ দিয়ে ত্বকে আঁচড় কাটি, তখন মূলত ত্বক সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখানে হালকা ব্যথাবোধ বা পেইন সিগন্যাল (Pain signal) তৈরি হয়। মানব স্নায়ুতন্ত্রের একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য হলো, তীব্র ব্যথার সংকেত চুলকানির সংকেতের চেয়ে দ্রুতগতিতে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে ত্বকে আঁচড় কাটার ফলে সৃষ্ট হালকা ব্যথা মস্তিষ্কের কাছে চুলকানির অনুভূতিকে সাময়িকভাবে ভুলিয়ে বা ব্লক করে দেয়।
কিন্তু মস্তিষ্ক যখন ত্বকের ঐ অংশে আঘাত বা ব্যথার উপস্থিতি টের পায়, তখন সেই ব্যথা প্রশমিত করতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে অবস্থান করে আমাদের আবেগ ও আনন্দের কেন্দ্র। ব্রেন ব্যথা দূর করার জন্য সেরাটোনিন (Serotonin) নামক নিউরোট্রান্সমিটার বা ফিল-গুড কেমিক্যাল নিঃসরিত করে।
সেরাটোনিন শরীরের ব্যথাবোধ কমিয়ে দিয়ে মানসিক প্রশান্তি ও আরামদায়ক অনুভূতির যোগান দেয়। কিন্তু বিপদটি ঘটে এখানেই! নিঃসৃত এই সেরাটোনিন একদিকে যেমন ব্যথা কমায়, অন্যদিকে তা পুনরায় প্রুরিসেপ্টর স্নায়ুকে উদ্দীপ্ত করে চুলকানির সিগন্যালকে আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমরা পুনরায় চুলকাতে শুরু করি, মস্তিষ্ক আবার সেরাটোনিন ছাড়ে এবং পুনরায় আমরা আরাম পাই। বায়োলজি ও নিউরোলজির ভাষায় একে বলা হয় Itch-Scratch Cycle বা চুলকানি ও আঁচড়ের চক্র। ঠিক এই কারণেই চুলকাতে মজা লাগে এবং রক্ত বের না হওয়া পর্যন্ত মানুষ থামতে চায় না।

অন্য প্রাণিরা কি শরীর চুলকায়?
মানুষের মতো অন্যান্য প্রাণীও কি শরীর চুলকায়? উত্তর হলো—হ্যাঁ, অবশ্যই। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ত্বকের স্নায়বিক গঠন মানুষের ত্বকের মতোই। বেবুন, বানর, শিম্পাঞ্জির মতো প্রাইমেট গোত্রের প্রাণীরা দলবদ্ধভাবে একে অপরের শরীর চুলকে দেয়, যাকে তাদের ভাষায় সোশ্যাল গ্রুমিং বলা হয়। এছাড়া কুকুর, বিড়াল ও গবাদি পশুদেরও থাবা বা শিং দিয়ে নিয়মিত শরীর চুলকাতে দেখা যায়।

চুলকানি ও ত্বকের গঠন বিষয়ক প্রধান পরিভাষাগুলোর তুলনা
চুলকানির পেছনে কাজ করা মূল জৈবিক উপাদানগুলোর ভূমিকা একনজরে বোঝার জন্য নিচের ছকটি দেখুন:
| উপাদানের নাম | অবস্থান/উৎস | প্রধান কাজ ও ভূমিকা |
|---|---|---|
| মাস্ট কোষ (Mast Cells) | ত্বকের ডার্মিস স্তর | জীবাণু শনাক্ত করে হিস্টামিন ক্ষরণ করে। |
| হিস্টামিন (Histamine) | মাস্ট কোষ থেকে নিঃসৃত কেমিক্যাল | অ্যালার্জি প্রতিরোধে কাজ করে ও চুলকানি তৈরি করে। |
| সি-ফাইবার (C-Fiber) | ত্বকের স্নায়ুতন্তু | চুলকানির সংকেত মস্তিষ্কে বহন করে। |
| সেরাটোনিন (Serotonin) | মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স | ব্যথা প্রশমিত করে আরাম ও আনন্দের অনুভূতি দেয়। |
প্রশ্ন এবং উত্তর
চুলকানি কি?
হিস্টামিনের ক্রিয়ার ফলে চুলকানি শুরু হয়।এই ক্রিয়ার সংকেত প্রুরিসেপ্টর স্নায়ু গ্রন্থিতে পৌছালে স্নায়ুগ্রন্থি উত্তেজিত হয় এবং সি-ফাইবার স্নায়ু তন্তুর মাধ্যমে প্রথমে সুষুম্নাকাণ্ডে পরে মস্তিষ্কে পাঠায়।মস্তিস্ক সংকেত বিশ্লেষণ করে চুলকানির অনুভূতি প্রকাশ করে।
সেরাটোনিন কি?
মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে অবস্থান করে আনন্দের কেন্দ্র। এখান থেকে ক্ষরিত হয় সেরাটোনিন নামক রাসায়নিক পদার্থ। সেরাটোনিন দেহের ব্যাথা ভুলিয়ে রেখে আরাম দায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করে।
হিস্টামিন কি?
ত্বকের ডার্মিস স্তরে সংবেদনশীল মাস্ট কোষ থাকে,জীবাণুকে মারার জন্য মাস্ট কোষ হিস্টামিন নিঃসরণ করে। হিস্টামিন অ্যান্টি অ্যালার্জিক পদার্থ।হিস্টামিনের ক্রিয়ার ফলে চুলকানি শুরু হয়।
সি-ফাইবার কি?
ত্বকের ডার্মিস স্তরে প্রুরিসেপ্টর নামক স্নায়ু গ্রন্থি থাকে এই গ্রন্থির একটি স্পেশাল স্নায়ু হলো সি-ফাইবার।সি-ফাইবার স্নায়ুর মাধ্যমে চুলকানির সংবেদন মস্তিষ্কে পরিবাহিত হয়।সি-ফাইবার স্নায়ুর মাধ্যমে চুলকানির সংবেদন মস্তিষ্কে পরিবাহিত হয়।
প্রুরিসেপ্টর কি?
ত্বকের ডার্মিস স্তরে প্রুরিসেপ্টর নামক স্নায়ু গ্রন্থি থাকে,এই গ্রন্থি চুলকানির অনুভূতি প্রকাশ করে।
Chulkate moja lage keno – অতিরিক্ত তথ্য নির্দেশিকা
অনেকে ইন্টারনেটে chulkale aram lage keno, chulkani, histamin ki, seratonin ki, chulkani ki, chulkate ato aram, body chulkay keno লিখে খোঁজ করেন। মূলত আমাদের মানবদেহের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে ত্বকে চুলকানির অনুভূতি তৈরি হয়। তবে অতিরিক্ত চুলকানোর ফলে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হতে পারে। তাই অনিয়ন্ত্রিত বা দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি হলে আঁচড় না কেটে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টি-হিস্টামিন সেবন করা বা কোল্ড প্রেস নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য সতর্কতামূলক ডিসক্লেইমার (Disclaimer)
ডিসক্লেইমার: এই নিবন্ধটি কেবল সাধারণ শিক্ষা ও বিজ্ঞান সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য রচিত। অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি কোনো মারাত্মক চর্মরোগ বা অভ্যন্তরীণ শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। যেকোনো তীব্র চুলকানি বা ত্বকের ক্ষতে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
#চুলকানি #চুলকাতে_মজা_লাগে_কেন #মানবদেহ #বিজ্ঞান #স্কিন_কেয়ার #HealthTips #BiologyBangla
Chulkate moja lage keno?
chulkale aram lage keno? chulkani , histamin ki? seratonin ki? chulkani ki? chulkate ato aram, body chulkay keno?
All photo credit Goes to sutterstock.com
